দ্বিধা জাগে

শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৪

আজ দ্বিধা জাগে –মাটির বুকে সুখের অস্তিত্ব নিয়ে,
শূন্যে ভেসে যাওয়া পাখির ডানায় সুখ দেখে ভাবি আমি-
হয়তো সব হয়ে গেছে লুট,এখানে শুধুই হাহাকার,
এ শুধু কেবলই বিরান ভুমি
-তাই দ্বিধা জাগে।

অরণ্যের কাঁচা সবুজের মাঝে বিষ কাঁটা,
চোরা-আগুন শুকনো পাতায়, দ্বিধা তাই পথ চলায়-
বিচরিত পতঙ্গের জীবন পারাপারে।
বাতাসের প্রানে বিষবাস্প,মিশে আছে মৃত্যুর ছায়া,
তবুও আশৈশব অভ্যস্ত,ক্রমেই ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া।
আজ প্রান ভরে শ্বাস নিতে -তাই দ্বিধা জাগে।

যে মাটির বুকে মানুষ বেঁধেছে ঘর, আজ বুঝি তা ভঙ্গুর,
যে আকাশ ভেবেছি সীমাহীন আজ তার সীমারেখা সম্মুখে।
আজ দেখি নক্ষত্র আলোক বিন্দুরও আছে অপমৃত্যু,
শতাব্দীর বুকে টিকে থাকতে পারে না ধীরেন কচ্ছপও।
ঘাস ফড়িং,রঙিন ঘুড়ি,দুরন্ত ফিঙে পাখিটার ডানায়ও-
ভর করে ক্লান্তি। ফুরিয়ে যায় প্রদীপের ভেজা সলতে
-তাই দ্বিধা জাগে।

স্বপ্নের জল সিঁড়ি বেয়ে ওঠা পথ হয়ে গেছে আগুনের পথ,
কোমল প্রেমও হয়েছে পাথর,এই নিরেট সভ্যতার বুকে দেখি-
পাথর জীবন, পাথরের ফুল, পাথরের চোখ।
কুমারী বুকের হিরণ্ময় দ্যুতি জ্বলে জ্বলে ফিকে হয়ে গেছে,
উগ্রতায় বিলীন হয়েছে মুগ্ধতা ।
প্রাচীরের মত স্তম্ভিত সুদিঢ় বিশ্বাস আজ দেখি ঠুনকো,
প্রশান্তির নীড়ে আঘাত হানে প্রবঞ্চনার বান
-তাই দ্বিধা জাগে।

আজ দ্বিধা জাগে,বলতে পারি না ভালোবাসি কেননা-
আমার ভালবাসাও হিংস্র, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির বাজপাখি,
আমি হতে পারিনি অপার্থিব মানুষ।
কাল-নাগের বিষফণা আমার হৃদয়ে,রক্তিম মৃত্যু হয়-
বিষদাঁতের ভয়াল ছোবলে যা বড় যাতনাময়
-তাই দ্বিধা জাগে।

মহাকালের বুকে জমা উজ্জ্বল ইতিহাস আজ দেখি মলিন,
ভাঙনের স্মৃতিকথা আজ হয়েছে উপক্ষেতি,হয়েছে রুপ কথার গল্প।
মূল্যায়ন শুধু অভিধানের পাতায় নিশ্চুপ ধংসের দিন গোনে,
আমারা যাকে সমাজ বলি তার বুকেই আশ্রয় গড়েছে-
পরজীবী ছত্রাক,প্রাননাশী ভাইরাস । নিত্য ছুটে চলেছে-
অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দুরন্ত পাগলা ঘোড়া
-তাই দ্বিধা জাগে।

ঘুণপোকার মত প্রতিনিয়ত জীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে জীবনই,
যে আনন্দ বেদনায় মানুষ বদলে যায় ক্ষণিকের তরে -
তার অস্তিত্ব কেবলই শূন্যতায়, স্পর্শের বাইরে ,
তাই- সবই মনে হয় অবান্তর।
যে সময়ের প্রত্যাশায় মানুষ কেবলই দিন গোনে-
পঞ্জিকার পাতার দিকে তাকিয়ে, তা চলে যায় নিঃশব্দে,
পড়ে থাকে শুধু যাতনাময় অযাচিত সময়
-তাই দ্বিধা জাগে।

বর্ণময় আলোকসজ্জায় বাড়ে সৌন্দর্য,বাড়ে পাপ-ধ্বংস, তবুও-
হাসিমুখ, ক্রিস্টালের আলোর খাঁজে কালচার।
বোধে নেই-শ্রদ্ধা , ঈশ্বরও আপেক্ষিক ,
কবিতা বইয়ের কষ্ট লেখা পাতায় বানানো ঠোঙা হাতে-
হেঁটে যায় জীর্ণ অবুঝ বালক,
নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয় অপ্রকাশিত লেখাগুলোর নিভৃতে
-তাই দ্বিধা জাগে।

জন্মের শুরু থেকে ক্ষুধা সত্য,চির অমর,
বাস্তবতায় নির্মম,নিষ্ঠুর অভাবনীয় নির্লজ্জ তাই-
ক্ষুধার্ত কাক, ক্ষুধার্ত শকুনের ঠোঁট দেখে জাগে শঙ্কা,জাগে মায়াও ।
এক টুকরো রুটি নিয়ে চলে যুদ্ধ ক্ষুধার্ত কুকুর আর-
দুর্ভাগ্যের বালকের সাথে । ভাগ্যবান মানুষেরও ক্ষুধা আছে কামের-
ক্ষুধা আছে লালসার ।
সর্বগ্রাসী ক্ষুধাও আছে এই পৃথ্বীতলে।
ক্ষুধার রাজ্যে কেউ ফুটপাতে,কেউ অভিজাত পান্থশালায়-
সাজানো শান্তি নিকেতনে,তবুও জাগ্রত অতৃপ্ততা ।
আমিও ক্ষুধার্ত হই , ভিতরে জেগে ওঠে নির্লজ্জ এক স্বত্বা,
তবে কি আমার ভিতরে দ্বৈত স্বত্বার সাংঘর্ষিক বসবাস?
নাকি আমিও অমানুষ?
-আজ দ্বিধা জাগে।

দ্বিধা জাগে- মনে, প্রতিটি ক্ষণে, কারনে অকারণে-
দ্বিধা জাগে- জীবনের কঠিন বাস্তবতার সম্মুখে দাড়িয়ে,
দ্বিধা জাগে- হৃদয়ের মাটিতে বোনা স্বপ্ন বীজের অঙ্কুরতায়,
দ্বিধা জাগে- মূর্তিমান বেদনায়,প্রানবন্ত উচ্ছ্বাসের আলোয়,
দ্বিধা জাগে- অর্বাচীন পাখির ঠিকানাহীন জীবন যাপনে,
দ্বিধা জাগে- হিংস্র শিকারির চোখে হিংস্রতা আবার মায়া দেখে,
দ্বিধা জাগে- অতৃপ্ত আত্মার কান্না, হাসি,আস্ফুট গানে,
রহস্যময় নিকষ আঁধারের সূচনায়, ক্লান্ত ভোরের ক্লান্তি ভরা মুখে,
ক্ষীয়মাণ আলো শেষে অন্ধকারে ঝলসানো অগ্নি-নারীর মুখ দেখে
-আজ দ্বিধা জাগে।

দ্বিধা জাগে- সদ্য জন্ম নেওয়া রাঙ্গা শিশুর অজ্ঞাত কথায়-
মৃত্যুশয্যায় শায়িত বৃদ্ধর পৃথিবীকে জানানো চির বিদায়ের বানীতে।
দ্বিধা জাগে- মাটিতে পড়ে থাকা ভাঙ্গা পাঁজরের হাড়,মাথার খুলি দেখে,
দ্বিধা জাগে- নতুন সূর্যোদয়ে আবার তার নিভে যাওয়া অনুক্ষণে,
দ্বিধা জাগে- ব্যস্ত রাজপথে আবার তার নির্বাক ঘুমন্ত জনশূন্যতায়,
দ্বিধা জাগে- প্রোগৈতিহাসিক কালের সূচনার কথা শুনে,
সভ্যতার বুকে নির্মম ধ্বংসের দৃশ্যায়নে, দ্বিধা আজ-
রক্তে ভেজা পতাকায়, সার্বভৌমত্বে, অর্জিত স্বাধীনতায়।
আজ দ্বিধা জাগে- বিবর্তনে, এপার- ওপার, নির্বাসিত ঈশ্বরে ।

পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে জীর্ণ স্মৃতি

ধমনীর স্পন্দনের সাথে পেরিয়ে যায় সময়ের সহস্র প্রহর,
পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে আসে জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতা।
অতন্দ্র বূভূক্ষ হৃদয়ে বীভৎস উষ্ণতার ছোঁয়া এসে দোল খায়,
ঘুমন্ত জোনাকির দেহ ঢেকে গেছে গাড় কুয়াশার চাদরে।
অনুভূতিগুলো ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে অধীর অপেক্ষা করে,
প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস–দীর্ঘশ্বাস একাকার হয়েছে শূন্যতায়।
স্নিগ্ধ প্রভাতের পথে চলতে গিয়ে পূর্ণ হয়েছে হৃদয় রিক্তের বিষাদে,
কৃষ্ণকাশের নির্বাণ ধ্রুব তাঁরা দেখা যায় তবু ছোঁয়া যায় না।
মৃত নদীর বুকে অদৃশ্য ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পায় না কেউ,
শুধু অবহেলায় ফোটা কাশফুল ছুয়ে যায় সবাই তীব্র আগ্রহে।

ক্লান্ত তীর্থ যাত্রী বেশে দুঃখ হাটে- সমাগত প্রার্থনার প্রহরে,
সুবর্ণ ক্ষণের প্রত্যাশা কেবলই বিস্ময়ের বলয়ে বন্দি।
বিচূর্ণ বিচ্ছুরিত আলোর মাঝে মৃত স্বপ্নের লাশের স্তুপ,
ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে ভালবাসার মানচিত্র, পতাকা আর রোমাল।
রক্তাত্ত চিত্তের আর্তনাদ কেবলই গহীনেই বিলীন হয়,
ব্যস্ত রাজপথে নেমে আসে না অভিমানী মৌন মিছিল।
রক্তের দাগ মুছে আর কতটুকুই বা আড়াল করা যায় ক্ষত,
অশ্রুজলে কতটুকুই বা নেভানো যায় ভাঙা বুকের দাবানল।
ধর্ষিত সত্ত্বার নগ্নতা দেখে লজ্জিত হই নিজেই নিজের কাছে,
বাতাসের উপহাসে ব্যকারনহীন হয় মনের না বলা ভাষা।

দ্বৈতস্বত্বার গোপন মিলন দেখেনি কেউ, তবু জানে সবাই,
দেহের ধমনী, শিরার গভীর ষড়যন্ত্র আজ উন্মোচিত জনসমক্ষে।
এখনও নাকে লেগে থাকা ঘামের গন্ধে হই মাতাল-বেসামাল,
বিচলিত হই অতীত-বর্তমানের বিচ্ছেদ রেখার দৃঢ়তায়।
ভালবাসা ঘৃণা হয়ে ঘুরে বেড়ায় নিকষ আঁধারে,খাঁ খাঁ রোদে,
লাজ অন্ধ হয়ে চলে প্রকাশ্যে তবুও দ্বন্দ্ব হয় অপরাধবোধের সাথে।
মুহূর্তের পর মুহূর্ত চলে কেবলই অভিনব রঙ্গিন মুখোশে,
তবু, পিপাসার পেয়ালায় বদলায় না রং, শুধু তৃষ্ণা বেড়েই চলে।
অধিকারের আসন জুড়ে এক বিরাট শূন্যতা,হাহাকার স্পন্দন,
আশ্রয় খুঁজে খুঁজে নিজেকে বিলীন করাই হয়ত ভালোবাসার মানে।

নির্ঘুম বনবাসে এক নীরব অনুভূতি আমাকে আশ্রয় দেয় স্বইচ্ছায়,
বিষণ্ণতায় গাড় নীল ছড়িয়ে পড়ে সে তপোবনের আঙ্গিনা জুড়ে।
শীতল অনুভূতি হিম শীতল হয়ে জানিয়ে দেয় বেদনার স্পর্শকাতরতা,
জ্যোৎস্না বৃষ্টিতে ভিজে আমি চেয়ে থাকি আকাশের দিকে উদাসী হয়ে।
রহস্যের মাকড়শা জাল বুনে বুনে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আমার পাশে,
আমি গভীর প্রেমের আলিঙ্গনে বন্দী করি বাহুডোরে উদার চিত্তে।
শুকনো কিছু ঝরা ফুল ভিজে যায় আচমকা এক পশলা বৃষ্টিতে,
আমিও ভিজে যাই নিমেষেই তবুও ভেজে না রুক্ষ এ মন এতটুকুও।
বেড়ে যায় আঁধারী কষ্টের দৈর্ঘ্য,প্রস্থ, উচ্চতা আর শূন্যতার ওজন,
আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাই, বইতে পারিনা আর এত অসহন ভার।

পলাতক প্রশান্তি ফিরে আসে না আর এই অস্থির অশান্ত প্রান্তরে,
কেবলই একাকীত্বের নীল গোলাপ ফোঁটায় উর্বর ব্যথিত হৃদয়ে।
কালো প্রজাপতির দল এসে ভিড় করে এই নীল গোলাপ কাননে,
হুতুম প্যাঁচার বিরহী গানের সুরে মাতোয়ারা এই পোড়া মাটির মদিরা।
এক বিন্দু জল,নদী, সাগর, আকাশ আর মহাকাশ বাঁধা পড়ে সুতোয়,
আমার এক হাতে সেই মালা অন্য হাতে পুরনো এক পোড়া বাঁশি।
আমি ভারাক্রান্ত সুর তুলি,কিন্তু ধ্বনিত হয় না, শুনতে পায় না কেউ,
শুধু শুনতে পায় পোড়া মাটির উঠোনে বসবাসরত কুনো ব্যাঙের দল।
গহিনে-গোপনে অনুভূত পরশে এসে দোলা দিয়ে যায় অতৃপ্ত এক সুর,
আমি ভুলে যাই বর্তমান, মনে হয় অতীতের মাঝে আমার চির বসবাস।

অভিশাপের আগুনে পুড়তে দেখেছি আমি গোটা পৃথিবীর বক্ষ,
তবুও সে আগুন আমি জ্বালাতে পারিনি- নিষ্ঠুর,পাষাণ হয়ে।
বারংবার শুধু কেঁপে উঠেছি মনের জ্বলন্ত চিতার তপ্ত আগুনে,
আমি পুড়ে সহেছি, জেনেছি বেঁচে থাকা মানে দগ্ধ যন্ত্রণা।
নিষ্ফল আবেদন করেছি বিধাতার কাছে বড় অসহায় হয়ে,
তবু বদ্ধ দুয়ার খোলেনি একটিও, আমি শুধুই চেয়ে থেকেছি।
ঘর ভেঙ্গে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে থাকে-রুস্থ এক হৃদয়ের উঠোন,
ছিঁড়ে যায় প্রণয়ের অভিলাস,অদৃশ্য প্রেমের এক মায়ার বাঁধন।
প্রতারণার আঘাতে ভেঙ্গে চুরে চুরমার হয়েছে অনুভূত এক জগত,
প্রিয়ংবদায় পূর্ণ পৃথিবী শূন্য হয়ে পড়ে থাকে শূন্য বক্ষের কুঠিরে।

অস্পষ্ট হচ্ছে পৃথিবী-অনুভুত স্বপ্নে মরীচিকা পড়ে পড়ে,
দুষ্প্রাপ্য ক্ষুধাবোধ জেগে আবার ডুব দেয় আঁধারের কালো জলে।
স্বার্থের অপমৃত্যুতে জীবন হয়েছে আজ অসমভুজের মত,
চন্দ্রাভুক অমাবস্যার সুচনা তাই এই অসময়ের অনুপ্রান্তে।
সঞ্চারিত হয় স্মৃতির উঠোন জুড়ে ব্যথিত বেদনার ঘোলা জল,
কিছু শুকনো স্মৃতির পাতা ভিজে যায় সে জলে, আমি ছুঁয়ে দেখি।
নিষ্কলঙ্ক বহুরূপতা আজ আবিস্কার করি কলঙ্কের এক রুপে,
দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে ঘৃণা করি তবু ভেতরে ভালোবাসা পুঞ্জিভূত।
ক্ষণে ক্ষণে ত্যাজ্য করেছি নিজেই নিজের মনকে অসংখ্যবার,
তবুও এই মুক্ত কারাগারে বন্দী রয়ে গেছি নিজেরই অজান্তে।

আমি হেঁটে গেছি ধুলোমাখা পথ ধরে তোমার পায়ের চিহ্ন অন্বেষণে,
জানি বৃথা সব তবুও সে চলার মাঝে খুঁজে পেয়েছি অজানা তৃপ্তি।
চলতে চলতে কখন যেন মাটির সাথে ঘুমিয়ে গেছে নিজের ছায়া,
আমি ডেকেছি বহুবার তবু ঘুম ভাঙ্গেনি,দেয়নি সাড়া একটিবারও।
অবান্তর সময়ের হাত ধরে শুধুই আমি চলেছি ফের নিজেকে হারিয়ে,
ধূলিধূসর স্মৃতি পড়ে আছে এই ধুলোমাখা সারাটা পথের বুক জুড়ে।
নৈহৃত কিমবা ঈশান কোনের বাতাস এসে স্পর্শ করে অনুভূত শরীর,
আচমকা কেঁপে উঠি, নাকে লাগে সেই পরিচিত বাতাসের গন্ধ।
ধুলোয় আঁকা আল্পনা এলোমেলো হয়েছে ব্যথিত বাতাসের সঙ্গমে,
আজ সে পথে দেখি কেবলই দহন জালা, দগ্ধ দুঃখের স্পষ্ট মানচিত্র।

দ্বিপ্রহরের কাঁধে ভর করে আসে গোধূলি লগন হৃদয়ের ক্ষরিত রঙ্গে,
মৃত্যু সাঁতার দেয় সাদা মেঘের দল গোপন ব্যথার নীরব সাথী হয়ে।
নিশুতি প্রেমের আলপনা আঁকে মেঘেরা ঢেউয়ে ঢেউয়ে অপূর্ব ঢঙ্গে,
ডিঙ্গি নৌকার বৈঠা হারিয়ে যায় রঙের নরম জলের শুভ্র আবরণে।
প্রতিনিয়ত প্রতিস্থাপনের খেলা চলে দুরন্ত মেঘের পরতে পরতে,
ধুপ গন্ধহীন টুকরো মেঘেদের রতির সঙ্গী হয়ে থাকে শুধু রঙ।
কিছু স্বপ্ন মঙ্গলের অমৃত মৌন বাসনা জেগে ওঠে বিষণ্ণ অনুরোধে,
ফের মিলিয়ে যায় নক্ষত্রের অভিশাপে নীলাম্বরী আকাশের নগ্ন বুকে।
ব্যবচ্ছেদ হয় পুঞ্জিত স্মৃতির শিরোনাম, বিষাদ আর আর্তনাদের,
চোখ ফেটে জল আসে, বুঝি-আজ অশ্রুদের লুকোনোর জায়গা নেই।

চন্দ্র বিন্দুর নিঃস্বার স্বপ্নচোখ ছড়ায় এখন বিষাদী নীল আন্ধকার,
নিঃসৃত সে অন্ধকারে মিশে গেছে নাড়ীর স্পন্দন আর গাড় চুম্বন।
এখন অস্পষ্ট স্বরে ভেসে আসে বুক ফাটা আর্তনাদ আর কান্না,
হৃদয়ের উঠোনে নেমে আসে ভরা মলিন জ্যোৎস্না স্মৃতির কাতরে।
দুঃখের চিত্রকর শুধু দুঃখ আঁকে রাত্রি সুমুদ্দ্রের উত্তাল বুকে জেগে,
খেলে জলজ খেলা- জল, রং আর বেদনার মাতাল ঢেউয়ের সংমিশ্রণে।
বেদনার্ত জ্যোৎস্না ক্লান্তিহীন কথা বলে সে দুঃখের চিত্রকরের সাথে,
নিরবে নিঃশব্দে প্রতিটি নিঃশ্বাসে ফুসফুসের বায়ু কুটরি আন্দোলিত হয়।
হৃদপিণ্ডের নিলয় থেকে শিকল ছিড়ে স্মৃতি ছুটে বের হয়ে আসে,
নাকের ডগা তির তির করে কেঁপে উঠে ভিজে যায় মস্তিষ্কের বিচলনে।

অস্পষ্ট রঙ্গমঞ্চ আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভেসে উঠে হাসি মাখা সূর্য,
যেন রাত্রি সুমুদ্দ্রের তীরে প্রভাতের- প্রশান্ত,কোমল পুষ্পের বালুচর।
কিন্তু আজ আমার দৃষ্টি বন্দী হয়েছে কালো বেদনার বদ্ধ কারাতে,
কোমল প্রভাত আজ বড় অসহ্য, তিক্ত ব্যথার প্রারম্ভিক মনে হয়।
চোখের ভাষার ব্যাকরণ ভেঙ্গে সজ্জিত হয়েছে রোষানলের বর্ণে ,
একাকীত্বের নীল কষ্টে ডুবে ডুবে ফের ভেসে উঠি মায়াবী লগনে।
উচ্ছ্বাসিত আবেগ গলে পড়ে না আর রোদেলা আলোর বরিষনে,
পাথর মনে রোদ এসে প্রতিবিম্ব হয়ে ফিরে যায় তির্যক ভাবে।
রুক্ষ চোখের তাঁরায় আজ ভাঙা নূপুরের ছবি আর বিষধর ফণা,
স্মৃতির বিষ আজ আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলমান হয়ে আছে।

জীবন সায়াহ্নে দেখি স্মৃতির কাঁটাতার ,সীমান্তে প্রাচীর বেষ্টনী,
কাঁদা মাটির শব্দগুলো কিছু ঝুলে আছে কাঁটাতারে অসহায় হয়ে।
হৃদয়ের সব লুকোচুরি খেলা শেষ হয় এই সীমান্তে এসে,
অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে আসে মুক্তোদানা অশ্রু,বিবর্ণ অবিধান।
হাজার ও অভিলাষ পালিয়ে যায় আঁধারে, বিষণ্ণ অবগাহনের আলিঙ্গনে,
বহমান দু:স্বপ্নের রাত নিত্য সাথী হয়ে থাকে আমার একাগ্র চিত্তে।
পৃথিবীর কোল জুড়ে নিস্তব্ধতা নিয়ে এখন আর রাত নামে না,
চারিদিকে কোলাহল, মুখরিত দুঃখ, বেদনার দগ্ধ বিলাপে।
মনের অব্যক্ত বাসনা বিলীন হয়েছে নিবিড় মনের সীমান্তেই,
মৃত প্রেমের ভাঙ্গা হাড়ে পূর্ণ হয় আজ মনের শ্মশান,অস্ফুট শূন্যতা।

আমার কল্পিত সহস্র আত্মহনন দেখনি তুমি একটি বারও ফিরে,
দুরাত্মার সাথে স্বআত্মার দাবি তুমি অগ্রাহ্য করেছ তা বোঝনি।
শুধু ভেবেছো উদাস কবির মনের ক্যানভাস কেবলই হেঁয়ালি,
রঙতুলিতে এঁকেছি তোমার সমস্ত সত্ত্বা, প্রত্যয়ী প্রেম-তুমি দেখনি।
বিলোপিত বেলাভূমির বিবর্ণ বদন চেয়ে থাকে আমার দিকে,
বেদনা বিহঙ্গ রুপে বিচরণ করে বর্ণচোরা ভাঙা পাঁজরের আকাশে।
আমার পৃথিবী ভেঙেচুরে চুরমার প্রবঞ্চনার প্রলয়ী ঝড়ে,
অতৃপ্ত আত্মাকে আহত করে পাশ কাটিয়ে চলে গেছো সন্তর্পণে।
অন্ধকার দেয়ালের শেষ প্রান্তে এসে দাড়িয়ে থাকি আমি নির্বিকার,
শুধু জীর্ণ স্মৃতিগুলো এসে আমাকে সঙ্গ দেয় আরও নিষ্প্রতিভ করতে।

ব্যঙ্গ করে নিজের ছায়া অসহায় মনের আত্মচিৎকার শুনে,
ছাই হয়ে উড়ে যায় অঙ্গিকার আর প্রতিজ্ঞার রূপালী কাগজ।
আমি শুধু দেখি অপলক দৃষ্টিতে নীরব,নিথর,অসাড় হয়ে,
হাত বাড়াতে পারিনা, আঁকড়ে ধরার চেষ্টা বৃথা হয় বার বার।
ব্যথিত আক্ষেপে কেটে যায় সকাল,দুপুর,রঙ্গিন গোধূলি,
স্নিগ্ধ বাতাস রুক্ষ হয়ে ফিরে আসে ভাঙা জানালার চৌকাঠে।
আকাশে গোঁত্তা খাওয়া ঘুড়ির মত আজ অস্থির চিত্তের চিত্রা হরিণ,
সবুজের চত্বরে ঘুরে ঘুরে-উষ্ণ এক মরুর বুকে এসে দিশেহারা।
চোখে ভাসে শুধু চোরাবালি আর তৃষিত হৃদয়ের ধুক-ধুক-স্পন্দন,
তপ্ত রোদ্দুর মাখা উষ্ণ প্রাচীরে হেলান দিয়ে ভাবি একদিন সমুদ্রে ছিলাম।

বজ্রনিনাদে ফিরে পাই চেতন,গুরুগম্ভীর স্বরাগম মেঘে মেঘে,
ভিজে যায় শুকনো পাতাগুলো,কিন্তু রক্ত অশ্রুতে নয়,বৃষ্টি ধারায়।
তুমি কাঁদনি, কেঁদেছে আকাশ ব্যথিত হয়ে গভীর আবেগে,
কেঁদেছি আমিও আকাশের সাথে,তাকে স্নান ভেবেছে সবাই ।
রাত্রি কেঁদেছে আঁধারে মুখ লুকিয়ে,প্রভাতে তাকে ভেবেছ শিশির ,
শুধু আমি জানি- সমবেদনার সাতকাহনে সে রজনী ছিল একান্ত সাথী।
পাহাড় কেঁদেছে তাই নেমে এসেছে ঝরনা ধারা,বৃক্ষ ঝরায়েছে পল্লব,
সমুদ্রে উঠেছে অশ্রুর প্লাবন, তুমি দেখছ তবু অশ্রু আসেনি ও চোখে।
আমার ভাঙা পাঁজর দেখে মৃত্তিকার বুক ফেটে হয়েছে চৌচির,
তুমি ভেবেছো চৈত্রের খরতাপে তুচ্ছ ফাটল,আমি দেখেছি তা কষ্টের পরিতাপে।

জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতাগুলো উড়ে আসে মনের উঠোন জুড়ে,
এলোমেলো হয়ে যায় চারিপাশ অরুনন্দিত বাতাসের ঘূর্ণিতে।
ফুটে উঠা কোমল পদ্ম আজ অগ্নি মূর্তির মুখ হয়ে ভেসে ওঠে,
আলিঙ্গনের স্মৃতিকথা ভাঙ্গনের রুঢ় কথা হয়ে প্রাণে বাজে।
মেঘলা দিন কাটে না আর, নিন্দনীয় শুদ্ধতা মনের স্নিগ্ধতা ভাঙ্গে,
জানি প্রত্যাবর্তনও হবে না সুখের তবুও করি নীরব প্রত্যাশা।
পরাজয়ের বিস্মরণে আঁখিজল কেবলই কান্না নয় এ যে প্রেম,
ফানুসের মত উড়ে যায় স্বপ্ন – অজানা আকাশের ঠিকানায়।
বেঁচে থাকার কথা গাঁথা হয় আজ বোবা কান্নার মহাকাব্যে,
অন্ধকারাচ্ছন্ন নিঃসঙ্গতায় পথচলা আজ পোড়ামাটির উঠোন জুড়ে।

জানি আত্মাহুতিতে মেলেনা পরিত্রাণ, তাই বেঁচে আছি আজও,
কিছু ঋণ এখনও আছে বাকীর খাতায়, লেখা আছে অশ্রু দিয়ে।
ঘৃণায় নয় ভালোবাসায় শোধ হবে পুরনো হিসেব-নিকেশ,
আমানত অভিমান আমি ফিরিয়ে দেব তোমার শূন্য বিশ্বাসের ডালিতে,
বুকের ক্ষরিত কালো রক্ত দিয়ে আর এক বার সাজাবো তোমায়,
হৃদয়ের অভিধানে রাখা শব্দ-কথার মালা পরাবো তোমায় এবার।
তুমি দেখতে পাবে তবু স্পর্শ করতে পারবে না মৃত সে সত্ত্বাকে,
আরও কয়েক ফোঁটা রক্ত অশ্রু পাওনা আছে তোমার কাছে।
এই পোড়া মাটির উঠোনে এসে ফেলে যেয়ো সে অরুণিত জল,
জীর্ণ স্মৃতির শুকনো পাতা আরও একটু ভিজে যাক সে জলে।

অস্পর্শী চিঠি -১

অমৃতোপম অস্পর্শী,

অবরুদ্ধ দ্বার আজ খুলে গেছে নীরব যাতনায় । রূপালী রাতের অন্তিম লগ্নে অশরীরী হয়ে এসেছ তুমি ঘুম জড়ানো দুটি চোখের আঙিনায় । কিছুটা সময় কিছু কথা বলার প্রবল আগ্রহে ব্যকুল মনের অদম্য আকুলতাকে অগ্রাহ্য করতে পারছি না আর । কিন্তু তুমি তো তেপান্তরের মাঠে,আমার সীমানা ছেড়ে দূরে আরও বহু দুরে । তাই মনটা আজ উষ্ণ, বড়ই তৃষ্ণাতুর । জানি না খণ্ডিত মন নিয়ে অবিরত চলব আর কতটা পথ এই উন্মত্ত, আত্মদ্রোহী , আত্মভোলা আমি । জীবমন্দিরের এই অপূর্ণতা কবে পূর্ণ হবে জানি না । তবে , হৃদয়ের দহনজ্বালা থামাতে না পেরে রুদ্ধ -বাক বিচলিত হয়ে নেমে এসেছে আঙ্গুলের ফাঁকে এই সস্থা কলমে আর এক টুকরো সাদা কাগজের উন্মুক্ত বক্ষে। তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে, তাই ক্ষুদ্র এই লেখা । হৃদয়ে বন্দী কথামালাকে মুক্ত করে দিলাম বন্দিত তোমার নামে । কেমন আছ তুমি ? খুব বেশি-ই জানতে ইচ্ছা করছে ।
ইতি,
ধুসর স্বপ্নের আঁধার যাত্রী ।

অবশিষ্ট কিছু ধূসর কালো রঙ

আরও কত ফুল ফোটার ছিল হাসিমাখা নতুন ভোরের প্রারম্ভে,
কত পাখির কণ্ঠে ছিল সুমধুর সুর ওঠেনি তা আর জেগে।
লৃতিকার লুপ্ত জালে দেখা যায় লুণ্ঠনের ছাপ,ছিন্ন ভিন্ন দেহ,
লাবণ্য নেই,নেই সতেজতা সবুজ ঝাউ বনের বুকে সেই আগের মত।
নিরব বিদ্বেষে বিদায় নিয়েছে বিধ্বস্ত সুখ তাই-সময় আজ বিধুর ,
বিতৃষ্ণ বক্ষ কাঁপে না আর, পড়ে থাকে নিরেট পাথরের মত ঠিক।
প্লাবিত আঁখিজল নিয়েছে শুষে ধুধুময় মুখের মরু প্রান্তর।
আজ ক্লান্তি নেই, নেই পরিপ্লুত সেই চোখ, সবই যেন পরিভ্রষ্ট ।
দেখি পঞ্জিকার পাতার পরিবর্তন সেই একই নিয়মে শুধু,
আর সবই নিয়মচুত্ত্য,বিশৃঙ্খল,বিপ্রতীপ-ধুলি ধূসর কাব্য।
বাড়ন্ত লতাগুলো শুকিয়ে গেছে,শুকিয়েছে জল,পদ্ম পাতারাও বিষণ্ণ,
আকাশের সব রঙ বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে, অবশিষ্ট কিছু ধূসর কালো রঙ।

একটি শুভ্র ঘুমন্ত ফুল ফোটার অপেক্ষায়

বেলা প্রায় শেষ হয়ে এলো, বিদায়ী সূর্য আমাকে জানিয়ে দেয় তা,
আমি সূর্য ডোবা বিকেল দেখি, দেখি বিষণ্ণ সন্ধ্যার আগমন প্রত্যহ।
পাখির ডানায় ব্যস্ততা দেখে আমি নির্বিকার দাড়িয়ে থাকি অবেলায়,
মেঘ ভেসে যায়,সুদীর্ঘ পরিক্রমায় অঙ্কিত হয় কালের ক্লান্ত পদচিহ্ন।

কতদিন হল- আমার নিঃশ্বাস গুলো বন্দি বুকের অন্ধকার কারাতে,
মুমূর্ষ স্বপ্নগুলো জেগে ওঠে না আর, ভাসে না মুক্ত আকাশের প্রান্তরে।
ভাবি আমি, কত কাল পরে কাটবে এই কণ্টকময় নিমগ্নতার ঘোর,
কবে উঠবে জেগে – সজীবতার মাঝে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা।
জীবনের সব রং হারিয়ে ধূসরতার মাঝে হবে আর কত অবগাহন,
আর কত রক্তাত্ত সমুদ্রের বুকে একা একা ভেসে চলা শুধুই আনমনে।
কবে উষ্ণ রোদ্দুর এসে ছুয়ে যাবে আদ্র এ হৃদয়ের জীর্ণ আঙ্গিনা,
কবে সেই বৃষ্টি হবে রোদের সাথে, কবে ধুয়ে মুছে শুকিয়ে যাবে সব।

বেলা শেষ হয়ে এলে-শুনি কোন এক স্রোতাস্বীনির বুকের স্পন্দন,
দুচোখে আমার নিঃসীম আকাশ,তারার দীপালি,দলছুট সাদা মেঘ।
নিঃসঙ্গতার প্রাচীরে দাড়িয়ে তাকিয়ে থাকি একটি সোনালী ভোরের জন্য,
তাকিয়ে থাকি আমি – একটি শুভ্র ঘুমন্ত ফুল ফোটার অপেক্ষায়।

হৃদয়লোকে মলিন বিশ্বাস,চোখে বিষাদগ্রস্ততা

আজ আহত আমি তীক্ষ্ণ বিলাপে,প্রচ্ছন্ন বেদনার নীল তরঙ্গে,
প্রতীক্ষার পালা শেষে আমার মুঠো ভরা কষ্টের ধুলোমাটি।
কেবলই দুর্বলতা ভেবে পদদলিত হয়েছে নিঃস্বার্থ উদারতা,
ভাবনার আকাশে তাই দেদীপ্যমান আজ দুখের নক্ষত্র।
অহর্নিশ ভালোবাসাও অন্ধকার দেয়ালে নীরবে মিশে গেছে,
কোন অনুরাগে নয়,রক্তাত্ত হৃদয়ের ক্ষতে জ্বালা ধ’রে।
স্বপ্নগুলো অবলুপ্ত আজ,ব্যথিত চিত্তে জাগে অগ্নি-নোনা ঢেউ,
অনুসন্ধিৎসু মনের প্রকাশে তাই ব্যাবচ্ছেদ হয় হতাশার।
ধুপগন্ধহীন অনুভূতি জ্বলে জ্বলে নিভে আবার জ্বলে ওঠে,
দুরাকাঙ্ক্ষা ভেবে ফিরি পশ্চাতে তবুও ধেয়ে আসে যন্ত্রণা।
নিষ্প্রতিভ সুখের আঙ্গিনায় জমে জমে আরও ঘন হয় মেঘ,
অক্রিত্তিমভাবে পূজনীয় নীতি লুকিয়ে রাখে মুখ পরাজিত হয়ে।
অতৃপ্ত আত্মা বারংবার আহত হয়ে-দুমড়ে সংকচিত হয়,
ব্যস্ত রাজপথে তাই বুজে আসে চোখ একাকীত্বের গ্রাসে।
পড়ে থাকে ধুলো মেখে অন্তঃযাত্রীর অন্তিম ইচ্ছে গুলো,
দেহন্তরিত অনুভবে মিশে থাকে শুধু তার ধুসর-কালো ছায়া।
মর্ত্যলোকের বীভৎস বাস্তবতায় ছিন্ন-ভিন্ন হয় শুভ্র বাসনা,
হৃদয়লোকে থাকে শুধু মলিন বিশ্বাস আর চোখে বিষাদগ্রস্ততা।

একরাশ আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ ব্যাবচ্ছেদ

অনুভবের অন্দরে একরাশ আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ ব্যাবচ্ছেদ,
এখানে দাড়িয়ে হা-হুতাশ,অপূর্ণতার ভারি আলোকসজ্জা।
অর্বাচীন আমি-আমরা, সংখ্যার চূড়া ভেঙ্গে অনেকেই,
জাগতিক সময় রথের রশি হাতে ছুটে চলেছি অলক্ষে ।
কখনোবা থেমে যাই, পাখির কুলায় স্বপ্ন দেখে মুহূর্তেই-
থেমে যাই দ্বিধাবোধে,ব্যর্থতায় বাসা বাঁধে সুখ সন্তর্পণে ।
গাণিতিক সমীকরণ এখানে-মিথ্যে,মূল্যহীন, বায়বীয়,
অযাচিত আলিঙ্গনে দেখা দেয় বেদনার নৈসর্গিক প্রতিমূর্তি।
বিদ্রোহী আপন সত্ত্বার সংঘাতে শূন্য হয় এপার-ওপার,
বুজে আসে চোখ,আলোকিত পৃথিবী লুকায় গাড় অন্ধকারে।
ব্যক্তহীন কথার শিরোনামে ভিড় করে কষ্টের কুয়াশা,
ক্রান্তিকাল ফিরে ফিরে আসে রাশিচক্রের বর্গীয় গণনায় ।

কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাড়িয়ে

এখনও মোছেনি রক্তের দাগ-
বারুদের গন্ধ লেগে আছে নাকে
বাতাসে মিশে আছে আর্তনাদ,সহস্র বিদায়ী বার্তা,
ভাঙ্গা ঘরের চাল এখনও ওঠেনি দাড়িয়ে-
এখনও ঘুমন্ত কলি ওঠেনি পুরো ফুটে,
তবে কেন ফের যুদ্ধের আহ্বান?
কেন মিছে পড়ে আছে সংবিধান,তত্ত্বকথা,জ্ঞান?
স্বাধীন ভূখণ্ডে কেন পরাধীনতার ব্যবচ্ছেদ?
কেন আজও রাজপথে ক্ষত বিক্ষত লাশ?
সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলন্ত মৃতদেহের নিশান,
কেন ফের হাহাকার,অরদ্ধ ক্রন্দনধ্বনি?
কেন বিবেকের অপমৃত্যু?

নতুন সূর্যোদয় ঢেকে যায় দানবী ছায়ায়,
কেন মুক্ত বলাকা নিয়ে যায় শোকের বার্তা?
শুকুনেরা হানা দেয় রক্তের ঘ্রানে-
রক্তপিপাসু হায়েনার চোখে হিংস্র লোলুপ দৃষ্টি,
কেন ক্রমেই শুকিয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত ফুলের প্রান?
ভোরের নির্মল শিশিরে কেন আজ মিশে থাকে রক্ত?
কেন মায়ের চোখে শঙ্কা?
কেন আজ বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস?
কোথায় স্বাধীনতা ?

স্বরলিপির মনস্তাপে কাটে অষ্ট প্রহর-
লাঞ্ছিত আজ ভাষার বৈভব,স্বকীয়তা,
রক্তে ভেজা পতাকা আজ পদদলিত,
নিতান্ত অনিচ্ছায় স্বীকৃতি জ্ঞাপন,
কেন সত্য আজ মুমূর্ষ , কেন অন্যায় আজ চতুরাঙ্গি?
কেন এই অবক্ষয়?
কেন ধ্রুপদী আকাশে জমছে গুমোট কালো মেঘ?
কেন আজ বজ্জ্র নিনাদী সম্ভাষণ?
তবে কি এই ছিল চাওয়া?
নাকি সবই অদৃষ্টের অভিশাপ?

আজও অসহায় চোখের কোনে ক্ষুধিত অশ্রু,
এক টুকরো রুটির মাঝে বেঁচে থাকার মানে।
কেন আজও জীবন নিষিদ্ধ পারাপার?
দুখের দহনে হৃদয়ের বীভৎস রূপ,
কেন আজও ধর্ম বর্ণের বর্গীয় ব্যবধান?
কেন অর্থের মানদণ্ডে মানুষের পরিচয়?
কোথায় সাম্যবাদীতা ?
কোথায় অধিকার ?
কোথায় শিকল ভাঙ্গার গান?
গর্জে ওঠা প্রানের জাগরন ।


এখনও শুকিয়ে যায়নি পুরনো সেই ক্ষত,
ধর্ষিতা বোনের আঁচল এখনও ভেজা,
ম্রিয়মাণ আলোয় জ্বলে মলিন বদন-
এখনও অশ্রুতে ভেজা মৃত্তিকার উষ্ণ শরীর,
তবে কেন ফের অশ্রুর প্লাবন?
কেন জাগ্রত আজও কুৎসিত লালসা?
কেন মানুষ হয়ে মনুষ্যত্বকে বিসর্জন?
তবে কি হারিয়ে গেছে চেতনা?
মূল্যবোধ কি আজ অন্ধ,বধির,নাকি নিরেট পাথর?
কোথায় প্রান খোলা হাসির ফোয়ারা?

বার বার জ্বলে উঠে নিভে যায় ক্ষোভ-
অভিশাপের আগুনে পোড়ে মন,জ্বালা করে চোখ,
তবু পুরনো বিভীষিকা ফিরে আসে আবার
কেন ইতিহাস হয়ে যায় পরিহাস?
কেন যন্ত্রণা ভাগ্যলিপিতে বন্দী ?
সময় কেন আজ অযাচিত?
কেন নেই কোন পরিত্রাণ?
নেই প্রশান্তির পরাগে শুভ্র রেনু,
কিন্তু কেন ? কেন ?
কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাড়িয়ে থাকি কেবলই-
কিন্তু প্রশ্নরা মিলিয়ে যায় শূন্যতায়…

শুধু আমার ছুটি নেই

হারিয়ে গেছে সেই রংধনু আকাশ,নভঃপ্রাণ,রাত্রিমণি,ছেড়া মেঘ,রোদ্দুর
প্রহত ধুলোমাখা পথে নির্বিকার মিশে আছে সেই সব স্মৃতির পসরা।
আজ কুড়িয়ে নিলাম দুহাতে। কিছু ললাটে নিলাম মেখে-অর্ঘ ভেবে ।
অলীক কল্পনায় নয়,যা ছিল সত্য হয়ে অর্হনীয় অভিধানে ।
শোভিত বর্ণের বরণীয় অনুগল্পের তাজা প্রানের চিলেকোঠায় যা ছিল-
অবয়বশূন্য হয়ে কম্পিত,জাগ্রত অনুভূতির বাহুডোরে। আজ বুঝি আমি-
জয়ন্তী বৃক্ষের শাখা প্রশাখা শুকিয়ে গেছে সব,শুধু জীবন্ত তার মূল,
মুমূর্ষ প্রানের স্পন্দন ধ্বনিত হয় শুধু নিশ্চুপ মৃত্যুর আলিঙ্গনে।
ঈষদুষ্ণ সেই মাটির বুকে আজ দাড়িয়ে দেখি আমি ।অবিসংবাদী সেই-
বেদনাগুলো অশ্রু হয়ে এসেছে চোখের পাতায়, কিছু ব্যকরনহীন হয়ে-
পড়ে আছে বুকের অরণ্যে।যেখানে কোলাহল নেই,নেই ঢেউয়ের গর্জন।
অরুনলোচনে বাসা বাঁধে অরুনসারথী,অর্চিত ধুলো মেখে কাটে অর্ধ বেলা ।
কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় নূপুরের নিক্বণ।আমি শুনে চমকিত হই,
তারপর দেখি শূন্য প্রান্তর। যেন ছুটি নিয়েছে সবাই। শুধু আমার ছুটি নেই।

নিরাপরাধ এক নাগরিক স্বত্বার মৃত্যু

সক্রেটিসের দেওয়া হেমলক বিষের পেয়ালা আজ আমার হাতে,
নিরাপরাধ এই নাগরিক স্বত্বাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে সবাই।
কারও মাঝে কোন দ্বিধা,দ্বন্দ্ব কিমবা এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই,
আমি একবার থমকে দাড়িয়ে তাকিয়ে দেখলাম বেশ অকপটেই ।
অন্তিম মুহূর্তে আমি মৃদু স্বরে শুধু একটি কথাই বলেছি-
তোমরা জানো না মৃত্যু মানব জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
আমি জানি না কিছুই,তাই কোন তত্ত্ব কিমবা প্রকাশযোগ্য দর্শন নেই,
জ্ঞান নেই যাপিত জীবনের এই মূল্যবোধ,বিশ্বাস,মত,সংস্কারে।
তবে,জীবনের মানে উপলব্ধির মাঝে রয়েছে নিগুঢ় সার্থকতা,
মনুষ্যত্ববোধ,শ্রেয়কে প্রশ্রয় দিয়ে জীবন তৃষ্ণা মেটানোই অস্তিত্ব।
ন্যায়,সত্য,সাহস,ধর্ম,জ্ঞান,প্রজ্ঞা,দায়িত্ব,কর্তব্যের মোড়ক ছিঁড়ে-
একই সুতোয় বাঁধার নামই-চেতনাবোধের অদৃশ্য এক সেতু বন্ধন ।
একদিন তোমরা নিজেদের মুখোমুখি হলে-দেখা হবে অপরাধবোধের সাথে,
সেদিন উৎসারিত হবে নৈতিকতা,আত্মিক মনের এক অনন্ত আকাশে।।